পোলট্রি উন্নয়ন নীতিমালার চূড়ান্ত খসড়া

একদিন বয়সী বাচ্চা আমদানিতে নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব, দুর্যোগকালে সংকটের আশঙ্কা খামারিদের

একদিন বয়সী মুরগির বাচ্চা উৎপাদনে দেশ এখনো স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। ফলে চাহিদার ১০-১৫ শতাংশ আমদানি করতে হয়।

একদিন বয়সী মুরগির বাচ্চা উৎপাদনে দেশ এখনো স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। ফলে চাহিদার ১০-১৫ শতাংশ আমদানি করতে হয়। এমন প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি জাতীয় পোলট্রি উন্নয়ন নীতিমালা ২০২৬-এর চূড়ান্ত খসড়া প্রকাশ করেছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। এতে বাণিজ্যিক পোলট্রি পালনের জন্য একদিন বয়সী মুরগির বাচ্চা আমদানি নিষিদ্ধের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতেই আপত্তি জানিয়েছেন খামারিরা। যদিও দেশে সংকট দেখা দিলে আমদানি করা যাবে বলেও খসড়া নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে। নিষিদ্ধের বিষয়ে খামারিরা বলছেন, আমদানির বিষয়টি উন্মুক্ত রাখা প্রয়োজন। অন্যথায় দুর্যোগকালে পোলট্রি বাচ্চার বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানোর মতো ঘটনা ঘটতে পারে। ফলে প্রান্তিক খামারিদের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে। যার প্রভাবে মাংস ও ডিমের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে।

ডিম থেকে ফুটার পর থেকে ৭২ ঘণ্টা বয়সী পোলট্রির বাচ্চাকে একদিনের বাচ্চা বা ডিওসি বলা হয়। খসড়া নীতিমালার একটি ধারায় বলা হয়েছে, ‘বাণিজ্যিক পোলট্রি পালনের জন্য একদিন বয়সী বাচ্চা আমদানি করা যাবে না। কেবল একদিন বয়সী গ্র্যান্ড প্যারেন্ট স্টক এবং দেশে একদিন বয়সী বাচ্চার সংকট দেখা দিলে ক্ষেত্রবিশেষে প্যারেন্ট স্টক আমদানি করা যাবে’—এ নিয়েই আপত্তি খামারিদের। তবে সরকারের ভাষ্য, দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি করে ধীরে ধীরে আমদানিনির্ভরতা কমানোই এ নীতিমালার প্রধান লক্ষ্য।

বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোশারফ হোসাইন বলেন, ‘একদিনের বাচ্চার চাহিদার ১০-১৫ শতাংশ এখনো আমদানি করতে হয়। এছাড়া দেশীয় কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বাচ্চা উৎপাদন করে। ফলে কোনো একটি প্রতিষ্ঠানে বার্ড ফ্লু বা বড় ধরনের রোগ সংক্রমণে উৎপাদন কার্যক্রম হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে সেই সংকট কাটানোর সক্ষমতা নেই। তখন চাহিদা অনুযায়ী বাচ্চা মিলবে না।’ এতে ব্রয়লার ও লেয়ার উৎপাদনে প্রভাব পড়বে বলে দাবি করেন তিনি।

সিলেটের অয়েস্টার পোলট্রি অ্যান্ড ফিশারিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইমরান হোসাইন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমদানির সুযোগটা রাখা উচিত। এমনটি রাখা না হলে বাচ্চার দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় না। হঠাৎ করে যদি বার্ড ফ্লু বা অন্য কারণে বাচ্চা মারা যায় তখন কী করবেন? জরুরি মুহূর্তে উদ্যোগ নিয়ে তখন আমদানি করা সম্ভব হবে না।’

তিনি আরো বলেন, ‘পোলট্রির বাচ্চার দামে স্থিতিশীল রাখা, উৎপাদনের ধারাবাহিকতা ও রোগবালাইয়ের আগাম প্রস্তুতি হিসেবে আমদানির বিষয়টি উন্মুক্ত রাখা উচিত। তবে উন্মুক্ত মানে এটা নয় যে দেশী শিল্পকে ধ্বংস করে বাজার উন্মুক্ত করা। আমরা চাই এখানে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান থাকবে।’

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, দেশে পুষ্টি চাহিদা পূরণে পোলট্রি খাতের অবদান দিন দিন বাড়ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ৩৩ কোটি ৬০ লাখ মুরগি ও ৭ কোটি ৬ লাখ হাঁস উৎপাদন হয়েছে। এছাড়া ডিম উৎপাদন হয়েছে ২ হাজার ৪৪১ কোটি পিস।

শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, দেশের মোট শ্রমশক্তির ৪৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ মানুষ কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত। তবে পোলট্রি শিল্পের বিষয়ে নির্দিষ্ট করে এ জরিপে তথ্য নেই। বিভিন্ন সূত্রের মতে, ৮০ লাখ থেকে এক কোটি মানুষ পোলট্রি খাতের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। যাদের প্রায় ৮০ শতাংশই নারী। ফলে পোলট্রি শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলে পুষ্টি নিরাপত্তা ও অর্থনীতির পাশাপাশি সরাসরি প্রভাব পড়বে নারীর উপার্জনে।

বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) সভাপতি মোশারফ হোসাইন চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের যত বাচ্চার চাহিদা, তার ১০-১৫ শতাংশের মতো আমদানি করতে হয়। আমদানি তখনই করা হয়, যখন স্থানীয় বাজারে সেটি পাওয়া যায় না। প্রয়োজন হলে তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় বাজার থেকে বাচ্চা করা যায়। কিন্তু আমদানি করতে হলে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। খসড়া নীতিমালায় বলা হয়েছে, ক্ষেত্রবিশেষে একদিনের বাচ্চা শর্টেজ হলে আমদানি করা যেতে পারে। আমাদের আপত্তি এখানেই। কখন সংকট হবে তা আগে থেকে জানার সুযোগ নেই, তাহলে হঠাৎ সংকট দেখা দিলে কী হবে?’

তিনি আরো বলেন, ‘দেশে যেসব কোম্পানি বাচ্চা উৎপাদন করছে তাদের ফার্মগুলোয় বিভিন্নভাবে অ্যাটাক হতে পারে। বার্ড ফ্লু রোগ কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিতে পারে। ফলে কোনো একটি কোম্পানি এখানে ক্ষতিগ্রস্ত হলে বাজারের অস্থিতিশীলতা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন? এমন একটি ঘটনা ঘটলেই অন্তত এক বছর দেশবাসীকে ভুগতে হবে। ডিম উৎপাদনে মুরগির বাচ্চার অভাব দেখা দিলে ডিমের বাজারও তখন অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে। এজন্য আমদানি বন্ধ করলেও সেটি পরিকল্পনামাফিক করতে হবে। অন্যথায় প্রান্তিক খামারিরা এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।’

সবার জন্য বাচ্চা আমদানি উন্মুক্ত না করে উৎপাদনকারী ও বাজারজাতকারীদের জন্য সীমিত পরিসরে সুযোগ রাখা প্রয়োজন বলে মনে করেন বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক ও কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাচ্চা আমদানি সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা উচিত নয়। এখানে কিছুটা কড়াকড়ি থাকা উচিত। এটি করলে বাচ্চা উৎপাদনে স্বনির্ভর হওয়া সম্ভব হবে। তবে সীমিত পরিসরে বিশেষ করে ঘাটতি পূরণে আমদানির সুযোগ রাখতে হবে। যারা বাচ্চা উৎপাদন ও বিপণন করে তাদের জন্য প্যারেন্ট স্টকসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপাদানগুলো আমদানির সুযোগ রাখতে হবে। নতুন হ্যাচারি বাজারে এলে তারাও এ সুযোগ পাবে। তবে সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা ঠিক হবে না।’

সার্বিক বিষয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মুহাম্মদ জাবের বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাচ্চা আমদানি বন্ধের বিষয়ে খামারিদের আপত্তিটা আমরা পেয়েছি। এটা নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয়ে যখন সভা হবে, তখন বিষয়টা উপস্থাপন করব। ব্যক্তিগতভাবে আমিও আপত্তিটাকে অযৌক্তিক মনে করি না।’

আরও